ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ২৭ অক্টোবর ২০২০ ● ১২ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার  মঙ্গলবার ● ২৭ অক্টোবর ২০২০
শিরোনাম: কাউন্সিলর ইরফান কোয়ারেন্টিনে       রিফাত হত্যা : ১৪ কিশোরের রায় পড়া শুরু       দেশের ইতিহাসে প্রথম, তিন কার্যদিবসে হলো মামলার রায়       ফরাসি দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা       কাঁঠালবাগানে গলিতে পড়েছিল তরুণের লাশ       পাকিস্তানে মাদরাসায় বিস্ফোরণে নিহত ৭, আহত ৭০       দেশে ফিরেছেন রাষ্ট্রপতি      
প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: আলোর মুখ দেখছে না অনলাইন ক্লাস
আবু সাঈদ ইসিয়াম, ঢাবি
Published : Sunday, 18 October, 2020 at 2:04 AM, Update: 18.10.2020 2:12:59 AM


করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে চলতি বছরের মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। প্রথমদিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে অনলাইন ক্লাসে সবার সমান অংশগ্রহণ সম্ভব নয় বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান জানালেও মার্চের শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনলাইনে ক্লাস নিতে পরামর্শ দেয়। তবে পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখবে বলেও নির্দেশনা দেয়। এর মাস তিনেক পর ৭ জুলাই অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে প্রয়োজনীয় ডিভাইস, ইন্টারনেট ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদি না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘অনলাইনে বেশ যথাযথভাবেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীরা আগ্রহ সহকারে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করছেন। আর শিক্ষকরা নিয়মিত অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করছেন।’
ক্লাসের বাইরে অর্ধেক শিক্ষার্থী:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের প্রস্তুতিহীনতা, বিশ^বিদ্যালয়ের নিজস্ব কাস্টমাইজড সফটওয়ার না থাকা, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের জুম প্লাটফর্মে ক্লাস নেওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা, শিক্ষক প্রশিক্ষণে ঘাটতি, সব শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন না থাকার কারণে অনলাইন ক্লাস এখন পর্যন্ত খুব একটা আলোর মুখ দেখতে পারে নাই। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের বাইরেই থাকছে। দূরবর্তী জেলা ও দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেটের ধীরগতি ক্লাসের জন্য ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। কোনো কোনো এলাকায় ক্লাস চলাকালীন বিদ্যুতের লোডশেডিংও শিক্ষার্থীদের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রসঙ্গে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আফরা নাওমী বলেন, ‘আমাদের ব্যাচে মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৬০ জন। করোনাকালের আগে ক্লাসে প্রতিনিয়ত উপস্থিত ছিল  প্রায় চল্লিশজনের উপরে। আমি ঢাকাতেই থাকি। যার কারণে অনলাইন ক্লসে যুক্ত হতে আমার কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না; কিন্তু অনলাইনে আমরা দশ থেকে পনের জনের মতো ক্লাস করি। বাকি সহপাঠীরা গ্রামে থাকায় ইন্টারনেট জটিলতার কারণে যুক্ত হতে পারছেন না।’
মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সজীব আল মামুন বলেন,‘আমাদের ব্যাচে ২২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আছি। তবে অনলাইনে আমরা ১৭০ জনের মতো ক্লাসে প্রতিনিয়ত কানেক্ট হচ্ছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সবাই প্রথমদিকে যুক্ত হতে পারলেও ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত থাকতে পারেন না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, ‘করেনার কারণে আটকে গেছে আমাদের তৃতীয় বর্ষের একটি ল্যাব পরীক্ষা। সেই পরীক্ষা না নেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো ক্লাসেই নিচ্ছে না ডিপার্টমেন্ট। এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো অনলাইন ক্লাস হয়নি।’

পরীক্ষা ছাড়াই নতুন সেমিস্টার :
করোনাকালে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখার স্বার্থে এক শিক্ষাবর্ষ-সেমিস্টার ক্লাস শেষ হওয়ার পর পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ-সেমিস্টারের ক্লাস শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগ ও ইনস্টিটিউট প্রধানদের কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘এক সেমিস্টার শেষ করার পর আরেক সেমিস্টারের ক্লাস শুরু করার একটি নোটিস বিভিন্ন বিভাগে গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হলে সব পরীক্ষা নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।’
বেড়েছে শিক্ষা বৈষম্য:
করোনাকালে অনলাইনে ক্লাসের ফলে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকের অভিযোগ বেশিরভাগ শিক্ষার্থী প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করায় নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া সবার স্মার্টফোন নেই। যাদের আছে তাদের সবার পক্ষে প্রতিদিন চার-পাঁচ জিবি ডাটা কেনা সম্ভব নয়। তাই দিনে দিনে অনলাইন ক্লাস উপস্থিতি কমছে। ফলে তৈরি হচ্ছে বৈষম্য। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় ডিভাইস (স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, রাউটার) না থাকায় অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারছেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ শিক্ষা কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। করোনা আসার আগে অনেকেই টিউশন,পার্ট টাইম চাকরি, অনলাইনে ছোটখাটো ব্যবসাসহ বিভিন্নভাবে অর্থ উপার্জন করে নিজেদের খরচ কিছুটা হলেও নিজেরাই চালাতে পারত। বর্তমানে তাদের সেই আয়ের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ। ইতোমধ্যে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অনেকেই। তাই এই মুহূর্তে প্রতিদিন ইন্টারনেটে ডাটা কিনে বাড়তি খরচের কোনো উপায় নেই তাদের।
 
অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের শিক্ষার্থী সিরাজুল ইসলাম। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। আবার তাদের বড় একটা অংশ প্রত্যন্ত অঞ্চলের। আর ওই অঞ্চলগুলাতে মোবাইল কল করার জন্যও নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। সেখানে থ্রি জি-ফোর জি কল্পনাতীত অর্থাৎ ওই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস করার সুযোগ থাকলেও শুধু আর্থিক অসচ্ছলতা ও দুর্বল ইন্টারনেটের কারণেও ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ফলে তারা ক্লাস থেকে বঞ্চিত ও বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন।’
শিক্ষাবিদদের বক্তব্য:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘অনলাইনে পড়িয়ে কোনো আনন্দ পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন তো অনলাইন ক্লাস ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। সুতরাং আমাদের এটা করতেই হবে; কিন্তু আমার যেটা দাবি ছিলো, ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ছেলে মেয়ে ক্লাস করতেই পারছে না। সুতরাং একটা ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। ফলে এই বৈষম্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো অসম করে দেবে। আর অনলাইন ক্লাস মানে তো সবাই উপস্থিত থাকবে; কিন্তু বড় একটা অংশকে বাদ রেখে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আমার দায়িত্ব থেকে পড়াবো এটা আমার কাছে আপত্তিকর লাগে। তিনি আরো বলেন, এটা না হয় আপৎকালীন চলছে; কিন্তু সরকারকে এখনই কোমর বেঁধে নামতে হবে আমাদের দেশে যত অস্বচ্ছল শিক্ষার্থী আছে, তাদেরকে একটা ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সুবিধাসহ দিতে হবে। এটা ছাড়া অনলাইন শিক্ষাকে বৈষম্যহীন করা যাবে না।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘প্রথমদিকে আমাদের বিশ^বিদ্যালয় বলছিলো যাদের ইন্টারনেট নেই তাদের ইন্টারনেট সুবিধা দেবে, ডেটার জন্য আলাদা করে টাকা দেবে; কিন্তু আমরা খেয়াল করলাম, বিশ্ববিদ্যালয় একটা কথাও রাখে নাই। আমরা যতটুকু পেরেছিলাম করোনাকালে ডিপার্টমেন্ট থেকে আর্থিক সুবিধা দিয়েছি। অনেক ডিপার্টমেন্টে এটা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমি নিজেও ক্লাস নিতে গিয়ে দেখেছি ডেটা খুবই ব্যয়বহুল যেটা অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। আবার কোথাও আছে আসলে ইন্টারনেট সংযোগের পরিবেশও নেই। ফলে একদল ক্লাস করবে আরেকদল বঞ্চিত হবে। তখন আরো বৈষম্য বাড়বে। কারণ যারা আগে থেকে শহরে পড়েছে তারা এখনো ইন্টারনেট পাচ্ছে, আর যারা গ্রামে পিছিয়ে আছে, তারা আরো পিছিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং শিক্ষায় বৈষম্যটা আরো প্রকট হচ্ছে।’ ফেরদৌস বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তো নিজস্ব কোনো সফটওয়ার এখনো পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কাস্টমাইজড কোনো সফটওয়ারও নেই। কাস্টমাইজড সফটওয়ারে যেটা সুবিধা তা হলে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা আইডি নম্বর দিয়ে অনলাইন ক্লাস বা পরীক্ষায় ঢুকবে এবং বের হবে আর অন্য কেউ ঢুকতে পারবে না। আর এসব সুযোগ তৈরি না করেই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সেকেন্ড সেমিস্টার শুরু করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসব আসলেই আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে।’
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, “অনলাইনে বেশ যথাযথভাবেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীরা আগ্রহ সহকারে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করছেন। আর শিক্ষকরা নিয়মিত অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করছেন। আর যারা ক্লাসে অংশ নিতে পারছেন না করোনা পরবর্র্তীতে মেকআপ ক্লাস এবং তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন তা বিশ^বিদ্যালয় থেকে করা হবে।” এনএমএস।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com