ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  সোমবার ● ১৬ মে ২০২২ ● ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
ই-পেপার  সোমবার ● ১৬ মে ২০২২
শিরোনাম: ক্যাসিনো সম্রাটের জামিন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে দুদকের আবেদন       দিনাজপুরে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেলের ৩ আরোহী নিহত       সম্রাটের উন্নত চিকিৎসা দরকার : বিএসএমএমইউ       প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্পেনের প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা       ঢাবি ভর্তি পরীক্ষার প্রবেশপত্র ডাউনলোড শুরু        ক্যালিফোর্নিয়ায় চার্চে গুলিতে নিহত ১       জাপানি দুই শিশুর বাবার বিরুদ্ধে মায়ের আদালত অবমাননার আবেদন      
যেমন কর্ম তেমন ফল
মাহবুব আলী
Published : Thursday, 27 January, 2022 at 7:46 PM

মানুষ কীভাবে যে টের পেয়ে যায় কে জানে! সেলিনা রাত ভোর ভোর কাউকে ডাকতে চায় না। তার ঘরের ওপাশে উত্তর কোণায় বড়ছেলের ঘর। সে দরজায় এসে ঘুম চোখে মৃদু জিজ্ঞেস করে বসে, -
‘লোকটা এসেছে না?’
‘লোক বলছিস কেন মাসহাদ? সে তোর বাবা।’
‘সে তো বটেই, পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, এখনো চরিত্র শোধরাতে পারল না। লোকটাকে বাবা ডাকতে ঘেন্না হয়। তোমার হয় না?’
‘এসব কথা থাক বাবা। সকাল হোক।’
তারপর সকাল হলে যখন পাশের বাড়ির রেহমান মিয়া বাটিতে খুদকুঁড়ো আধার নিয়ে একঝাঁক কবুতরকে খাওয়াতে শুরু করে, আর গলির মধ্যে কেউ হেঁটে গেলে পাখিগুলো বাতাস কাঁপিয়ে ডানা ঝাপটে ইলেকট্রিক কি ডিস ক্যাবলে গিয়ে বসে যায়, আবারসুযোগ বুঝে নিচে নেমে আসে, খুঁটে খুঁটে শস্যদানা কুড়োয়, লোকটা বাথরুমে ঢোকে; তখন ঝপাত করে হাজারও কথা আর স্মৃতি হামলে পড়ে। সেলিনার বড় অস্থির লাগে, না জানি কি হয়; ছেলে দুটো বড় রাগি। আজও আবার নিজের বাবাকে কিল-ঘুুসি বসিয়ে দেবে নাকি? এর আগের বার নভেম্বরের শীত, মাসহাদ আর জামসেদ হুমকি দেয়, -
‘শোনো স্বভাব ভালো করতে না পারলে এখন তো দু-চারটা থাপ্পড় খেলে, তখন জুতো দিয়ে পিটাব। নিজে তো ন্যাংটা মানুষ, আমাদেরও শেষ করে ছেড়েছে। কারও সামনে মুখ দেখাতে পারি না।’
সেলিনা একটু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। মাতাল মানুষ মার খাওয়ার কাজ করলে বাদ থাকবে কেন? প্রথমত শুরু করেছিল তো সেই। লোকটা দু-হাতে মুখ ঢেকে বারবার বলে, -
‘পিঠে...পিঠে দাও, মুখে মেরো না, দাগ পড়ে যাবে।’
‘দাগের বাকি কী রেখেছ? কলঙ্কের দাগ সবার জীবনে লেগে গেছে। শালা চরিত্রহীন মানুষ।’
অবশেষে সেলিনা এগিয়ে ছেলেদের থামায়। ছোট ছেলে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে, সেও ছাড়ল না। জবেদ এতকিছুর পরও ঠিক হয় না। আসলে সে কি মানসিক রোগী? মানসিক বিকৃতি বা স্যাডিস্ট? জবেদের যখন রংপুর পোস্টিং হলো, সেও যেতে চেয়েছিল। কত বছর আগের ঘটনা? তখন মাসহাদ আট-দশ বছরের। দিনাজপুরের নামকরা মিশনারি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। জবেদ বাবা হিসেবে দায়িত্ববান মানুষ। সবদিকে সতর্ক খেয়াল। ভোর সকালে বিআরটিসির বাসে উঠে বারবার বলে, -
‘সেলিনা শোনো, তুমি নিজে পড়াবে মাসহাদকে। প্রাইভেট টিউটর কী পড়ায় লক্ষ্য রাখবে।’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, চিন্তা করো না। আর রংপুর তো কাছেই। দু-তিন পর পর চলে আসবে।’
‘সে আর বলতে!’
জবেদ কোল থেকে জামসেদকে ওর মায়ের কাছে তুলে দিতে দিতে আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, -
‘বাবুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেও। তিন বছর হয়ে গেল কফ এখনো সারছে না।’
‘সিজন চেঞ্জ হচ্ছে তো। সেরে যাবে। তুমি অত ভেবো না।’
‘তারপরও একবার কনসাল্ট করতে সমস্যা কোথায়? হাজার টাকা না হয় খরচ হবে।’
‘আচ্ছা, তুমি দেখেশুনে যেও। পারলে সামনের বৃহস্পতিবার চলে এসো।’
‘চেষ্টা করব। বড় পদে চাকরির ঠ্যালাও বড় বুঝলে। অ কে যাও। ভালো থেকো। বাই।’
‘তুমিও ভালো থেকো। আল্লা হাফিজ।’
এমন মানুষ কয়েক বছরে কেমন করে বদলে যায়? সেলিনা ভেবে ভেবে কারণ বুঝতে পারে না। নিজ জেলা থেকে বদলির প্রথম ছয় মাসেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। প্রথম প্রথম প্রত্যেক সপ্তাহে বাসায় এসে আনন্দ-ফুর্তি হইচই করে এক-দুই দিন থেকে আবার বাসে ওঠে জবেদ। সেলিনার ভরসা বাড়ে। সুখের দোলা বুকে ভেসে যায়। এরপর আকস্মিক দু-তিন মাস কোনো খবর নেই। টিএনটির টেলিফোনে অফিসে যোগাযোগ করলে উলটো কথা।
‘কী হয়েছে শুনি?’
‘তুমি কেমন আছো?’
‘আছি আছি...ভালো আছি। পরে কথা বলব, এখন ছাড়ছি, অনেক কাজ।’
‘আমরা কেমন আছি জিজ্ঞেস করলে না?’
‘বুঝতেই তো পারছি, বেশ আরামেই আছো। সুখে আছো।’
‘তুমি না থাকলে ভালো লাগে?’
‘এসব ঢঙের কথা বাদ দাও। খাও-দাও ফুর্তি করো।’
জবেদ সহসা সংযোগ কেটে দেয়। আহত তো হয় সেলিনা। এত দ্রুত বদলে যায় মানুষ! কাজ নিয়ে এত কেন টেনশন! অথবা কে জানে কী করে বেড়ায়। বিয়ের পর যা শুনে এসেছে সে-সব কি তবে...না তা হবে কেন? তার মন মন্দ ভাবে। মন্দ মন সবকিছুতে খারাপ দেখে। জবেদ তেমন নয়। পুনরায় বুকের মধ্যে খচখচ কৌতূহল। কোথাও নতুন কোনো সম্পর্ক করে নেয়নি তো? পুরুষ মানুষ, বাইরে কোথায় কী করছে, কারও সঙ্গে কোনো সম্পর্ক; ধরা মুশকিল। এমন সন্দেহ মনের মধ্যে গুনগুন করলেও কখনো কোনো কাউকে কথা বলে না সে। জবেদ ভালো ছাত্র। এসএসসিতে পাঁচ বিষয় লেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশন। এই কলেজ ওই কলেজ তাকে নেওয়ার জন্য কি উৎসুক! জবেদ কিনা ভর্তি হয় টেকনিক্যালে। উদ্দেশ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হবে। পাঠ শেষে সরকারি চাকরি হলো। সেলিনার বাবা যৌতুক নয়, উপহার হিসেবে দুই বিঘে আবাদি জমি, একটি দিঘি, যার পরিমাণ এক একর আর নগদ ক্যাশ সাত লাখ টাকা তুলে দিল। তখনকার সাত লাখ মানে কোটি টাকা। একটিমাত্র মেয়ে। সেই মেয়ে সুখে থাক। সেলিনা সুখেই ছিল। নতুন বউ হয়ে বাড়িতে পা রেখে দু-চার মাসের মধ্যে অনেক কু-কথা কানকথা শুনেছে, মাথায় তোলেনি, মানুষের মন খারাপ, নোংরা বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করে আনন্দ পায়, অন্যের সুখ-শান্তি দেখে বুক জ্বলে কারও; সে ওসব কথা শুনবে না। তারপরও রাশিদা এক ধুপছায়া দুপুরে ফিসফিস করে ওঠে, -
‘হ্যাঁ বু, জবেদের কথা আগোত্ জানেছিলু না?’
‘কী কথা আয়েশার মা?’
‘ক্যানে? এক রাইতোত্ পাড়ার তামাম মানুষ ওক ধরি পিটাইছিল। সুরুজ মিয়ার বউয়ের সাথোত খারাপ কাজ করিবার সমায় ধরা। বিচার সালিশ হইছিল। দশ হাজার টাকা খেসারত। ওই বেটিছুয়াও ভালো নহায়, বেশ্যা মাগি।’
‘কই এমন কথা তো শুনি নাই।’
‘ও মা! ক্যাংকরি তাইলে বিয়াত বসিচিস বইন? জবেদ এত্তি-ওত্তি এ্যাইলাই করি বেড়াছেল। এ্যালায় অবশ্যি তেমন শোনা যায়ছে না।’
‘এইসব কথা আমাকে আর বলবে না আয়েশার মা।’
‘মুই কি সাধে কছি বইন, লোকটাক বগলে চাপি রাখিবু, ফসকি গেইলে শ্যাষ।’
যত সহজে কুৎসিত কথা উড়িয়ে দেওয়া যায়, তারচেয়ে কঠিন মুছে ফেলা; মোছা যায় না। গুবরেপোকার মতো আধভেজা গোবরের মধ্যে খুঁচিয়ে দুর্গন্ধ তুলতে থাকে। সেলিনার কত রাত ঘুম হয় না কে বলে সেই কথা? কাকে বলবে? যখনই মনে পড়ে দু-চোখে আর ঘুম আসে না। জবেদ পাশে শুয়ে থাকে। তাকেও বড় অচেনা আর বীভৎস লাগে। তারপর কোনোরাতে যখন নিজেকে ছড়িয়ে দেয়, দিতে বাধ্য হয়, মনে হয় দূরাগত হুংকার তুলতে তুলতে হিংস্র কোনো পশু তাকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে ঝোপঝাড়ে ঘুরে বেড়ানো কোনো তক্ষক বুঝি বাড়ির আঙিনায় হেঁটে হেঁটে ঘরের মধ্যে এসে মাথা উঁচু বিকট তীক্ষè আওয়াজ দিতে থাকে।
সেই বুঝি সব সত্য হলো। জবেদ অনেকদিন বাইরে থেকে এসেও বাড়ি ফিরে তেমন বিরহকাতর হয় না। সেলিনা কখনো যেমন আনমনে তাকে স্পর্শ করে বসে, প্রত্যাখ্যাত হয়ে খুব লজ্জা পায়; নিজের মধ্যে এতটুকু হয়ে পড়ে। নিজের মানুষের কাছে লজ্জা কি? আবছায়া আলোয় বেড়ালের মতো চোখদুটোয় দৃষ্টি রেখে ফিসফিস করে, -
‘তোমার ক্লান্তি লাগছে? শরীর খারাপ?’
‘একটু ঘুমাতে দাও তো, ম্যালা ফ্যাচ ফ্যাচ করো তুমি, আগে তো কথাই কইতে না, এখন আবার এত বকবক করো কেন এ্যাঁ!’
‘তোমার কাজের খুব চাপ না?’
‘সরকারি কাজ, চাপ তো থাকবেই, তারউপর বিল্ডিং তৈরির ইঞ্জিনিয়ারিং; অনেককিছু দেখতে হয়। কত কড়াই বালুতে কয় বস্তা সিমেন্ট মেশাতে হবে সেটাও নজরে রাখতে হয়। তুমি পারবে?’
‘আমি কি সরকারি চাকরি করি?’
‘তবে চুপ করে ঘুমাও আর আমাকেও ঘুমাতে দাও। কাল আবার সামাদচাচার সঙ্গে কথা বলতে হবে। বড় ঘোড়েল লোক।’
‘আবার জমি কিনছ? এই তো গত মাসেই পঁাঁচ বিঘা নিলে।’
‘কেন? জমি কিনে রাখলে তোমার খুব কষ্ট হয় নাকি? আ রে এসব তো তোমাদের জন্য করছি। মাশহাদ-জামসেদ এদের ভবিষ্যৎ আছে না?’
‘সে আমি বলছি না, সম্পদ-সম্পত্তি যত করা যায় তত নিরাপত্তা, কিন্তু মানুষের চোখ টাটায়, কেউ খারাপ কথা বলে। আচ্ছা এত টাকা কোথায় পাও?’
জবেদ বিছানায় উঠে বসে। লাইট অন করে ভয়ংকর দৃষ্টি ফেলে। সেলিনা সত্যি ভয় পেয়ে নিজেকে দোষে। কী দরকার ছিল এসব বলার? জবেদ তখন সিগারেট জ্বালিয়েছে। সেলিনার দম বন্ধ হয়ে আসে। সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারে না, কিন্তু এখন কী করবে? সেও উঠে জড়সড় বসে থাকে।
‘শোনো দেশে সব শালা মাদারফাকার, সবাই চুরি করে, আমি একা না, যার সুযোগ আছে সে কখনো ছেড়ে দেয় না। তুমি ছেড়ে দেবে? এই যে আমি এখানে থাকি না, তুমি কোন্ সতীনারী যে ঘরের কোণে চুপ করে বসে থাকো, এদিক-ওদিক কী করে বেড়াও বুঝি না?’
‘এসব কী নোংরা কথা বলছ তুমি? আমি চরিত্রহীন?’
‘তোমার ফুপাতো ভাই রাইসুল এখানে এসে দু-দিন তিনদিন থেকে যায়, সেই মানুষ কি সাধুপুরুষ? তোমরা একসাথে শোও না?’
‘কী বললে? আমার এমন পরহেজগার নামাজি ভাইটিকে এভাবে বলছ? আমাকে সন্দেহ করো? ছি ছি ছি! তুমি আসলে একটা নোংরা মানুষ। তোমার মন অসম্ভব কুৎসিত। ছি ছি ছি! এসব বলো না। হায় হায় কি পাপ...কি পাপ কথা!’
‘পাপ? মাগি এসব পাপ?’
জবেদ আকস্মিক চুলের গোছা চেপে ধরলেও কোনো শব্দ করে না সেলিনা। ছেলেরা পাশের ঘরে ঘুমিয়ে আছে। কে জানে জেগে উঠেছে কিনা! রাত কত? শাশুড়িও বারান্দার দক্ষিণে ছোট্ট ঘরটায় শুয়ে আছে। বয়সি মানুষের ঘুম পাতলা। সব শুনে ফেলল নাকি? কি লজ্জা! জবেদ তাকে ভাবনা কিংবা দুর্ভাবনার সুযোগ দেয় না। বাঘ যেমন হরিণ শাবক কামড়ে ধরে ঝোপের প্রান্তে টেনে নিয়ে ধারলো জিহ্বা-দাঁত আর নখরে ছিন্নভিন্ন করতে থাকে, তার তখন সেই রুদ্্রমুর্তি। সেলিনার কী করার আছে, নিশ্চুপ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করা ছাড়া? পুরুষের সমাজ পুরুষই মালিক।
আজ কত বছর হয়ে গেল এখন আর কোনোকিছুই গোপন নেই। সেলিনা সব জানে, এমনকি নিজের সন্তান, তারাও সময়-অসময়ে কথা বলে। বড় হয়েছে। আবেগের কোনো বয়স নেই, রাগেরও; আজ কয়েক মাস সেইসব দেখা হলো। জবেদ পরিবারের সকলের চাহিদা পূরণ করে বটে, কিন্তু বিশ্বাস আর সম্মানের আসন ধ্বংস করে দিয়েছে। রংপুর থেকে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা-সিরাজগঞ্জ-গাইবান্ধা কত জায়গায় বদলি হলো, কত ছুটি পেরিয়ে এলো, সপ্তাহে দু-দিন ছুটি; তারপরও মাসের পর মাস বাড়ি ফেরে না। সেটি কি সেদিনের কথা ভেবে? সে তো দেখতে দেখতে প্রায় দুই-তিন বছর কেটে গেল। সেলিনা ভুলতে পারে না, দুঃসহ স্মৃতির সময়-ক্ষণ, আর যাকে নিয়ে গর্ব-অহংকার, সব কীভাবে কত সহজে ভেঙে যায়। বর্ষার রাতে এসেছিল জবেদ। আকাশে তেমন মেঘ নেই, সারদিন বৃষ্টি শেষে বাতাসও বুঝি ক্লান্ত। জবেদের সঙ্গে মেয়েছেলে। মানুষের দৃষ্টি অনেককিছু বোঝে না। সেলিনা ভেবে নেয়, অফিসের কেউ হবে। তার জন্য অতিথি ঘর খুলে দেয়। অনেক যত্নে এটা-ওটা রান্না করে তাগিদ দিয়ে দিয়ে খাওয়ায়। জবেদ কিনা মধ্যরাতে তার সঙ্গেই, ছি ছি ছি কি লজ্জা! সেই রাতে প্রথমবার হাত তোলে সেলিনা। পাড়াপড়শির জটলার মধ্যে সবার সামনে, ইচ্ছে করছিল, জুতো পেটা করে; কিন্তু ধীরে ধীরে রাগ পড়ে গিয়েছিল। যার সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে হবে, আদৌ থাকতে পারবে কিনা কে জানে; কয়েকদিন বাবার বাড়ি থেকে শান্ত হয়। আহা মানুষটি শেষে হাত-পা ধরে অনুতাপ করে! পুরুষ মানুষ একটু-আধটু না হয় অন্যায়-অপরাধ করে ফেলেছে। নিজের মানুষটিকে তো চেনে সেলিনা। কি ব্রুট কি ভয়ংকর! তারপর সেই ঘটনা, কথা আর স্মৃতি কফিনে পুরে কবরে শুইয়ে দেয়, কিন্তু ওই যে কথায় বলে, যে গরু গু খায় তাকে সামলানো কঠিন; কুকুরের লেজ সোজা হয় না। জবেদ যে অনেক আগে থেকেই এইসব অপকর্ম করে বেড়াত, লুকোচাপা কুৎসিত গুজব সব সত্য হয়ে উদ্ভাসিত হয়ে যায়। সেলিনা তবু সংসার ভাঙতে চায়নি। মা-বাবা বারবার তাগাদা দিলেও অনড় থেকেছে। একটু হয়তো আশা-প্রত্যাশা জীবনের তলানিতে পড়েছিল। জবেদের কত দিন তেজ থাকে? একদিন সব নেমে যাবে। অথচ বাহান্ন-চুয়ান্ন্ন বছরে এসেও বুড়োর ভীমরতি। জবেদ রুচিতে আরও নীচে নেমে গেছে। সাইটের মহিলা লেবারের পেছনেও দেদারসে টাকা খরচ করে। সেলিনা সেই খবরও পায়।
জবেদ মাস দুয়েক আগে এসেছিল। মধ্যরাতে এক-দু কথায় শুরু হয়ে তুলকালাম। সেলিনার শাশুড়ি, মাসহাদ-জামসেদ ঘুম থেকে উঠে সামনে এসে দাঁড়ায়। সেলিনা ধরাশায়ী। জবেদ দু-হাতে এলোপাথারি ঘুসি মারছে। মাসহাদ-জামসেদ সহ্য করতে পারেনি। সেই প্রথম ছেলের হাতেও মার খায় জবেদ। জামসেদের রাগ বেশি। সেলিনা যখন বড়ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে, তার দৃষ্টিতে সেই ছায়া, ছোটছেলে দু-হাতে পেটাচ্ছে। জবেদ নিজেকে আত্মরক্ষারও সুযোগ পায় না। সেলিনা কঁকিয়ে বলে ওঠে, -
‘জামু তোর বাপ হয় রে...গায়ে হাত তুলিস না বাপ।’
‘আমি একে মেরেই ফেলব, শালা বদলোক, চরিত্রহীন। এরজন্য স্কুলে রাস্তায় মুখ দেখাতে পারি না।...লজ্জা করে না তোর? শালা হারামজাদা জারুয়ার পয়দা।’
সেলিনা আর কী বলে? তার দু-চোখ অন্ধকার হয়ে আসে, বিছানার চারপাশ কি ভয়ংকর দুলতে থাকে; আর কিছু মনে নেই। জবেদ পরদিন খুব ভোরে বেরিয়ে যায়। এরপর আসেনি। যোগাযোগ করেও উত্তর পাওয়া যায় না। একদিন মাসহাদ গাইবান্ধা ঘুরে আসে। কলেজের থার্ড ইয়ারের ছাত্র। জগতের সকল কিছু চিনে নেওয়ার আগ্রহ অনেক, নিষেধ সত্ত্বেও রাতের কোচে রওয়ানা হয়; পরদিন ফিরে এলে মুখ-চোখ গম্ভীর দেখে আঁতকে ওঠে সেলিনা। কোনো অঘটন হয়নি তো? মাসহাদ কিছু বলে না। একদিন-দুদিন নিশ্চুপ হয়ে একাকী জ্বলতে থাকে। সেলিনা বোঝে সেই দহনের মর্মজ্বালা। অনেক কষ্টে পেটে লালন করেছিল যে! অবশেষে রাতে খেতে বসে শুধু একটি কথা বলে আর সেটিই বিশাল বিস্ফোরণ হয়ে চারিদিক ছড়িয়ে যায়।
‘মা লোকটা ঠিক হয়নি। আর জানো, ওখানের লেবার-মিস্ত্রিরা আমাকে দেখে হাসছিল। এবার আসুক।’
‘ব্যাটাকে এমন মার দেব সব শিক্ষা দূর হয়ে যাবে।’
জামসেদ যখন এই কথা নাকি সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেয়, সেলিনা কী বলে, কোন্ প্রতিরোধ ব্যূহ তৈরি করে? কেন আর কীভাবে? একটি মানুষ, যাকে এত ভালবেসে কত গর্ব কত অহংকারে মাথায় তুলে রেখেছে, তার নিজের কাছে না হোক ছেলেদের কাছেও অপমানিত করতে পারে?
জবেদ এসেছে। ভোররাতে চেনা সিগারেটের গন্ধে আঙিনার বাতাসও বুঝে গেছে কার উপস্থিতি। এখন তার রূপ-চেহারা কেমন? তার সকল বদঅভ্যেস কি দূর হয়েছে? কে জানে। সেলিনা কিছু জানে না। অনুমান করতেও পারে না। তখন বারবার সেই রাতে মাসহাদ আর জামসেদের রাগ মনে পড়ে যায়। সকালে কী হতে পারে কে জানে। সেলিনা এইসব ভেবে ভেবে উৎকণ্ঠায় স্থির-অনড়, অথচ বুকের ভেতরে কেউ বুঝি খামচে কাঁপুনি তোলে।
এদিকে ধীরে ধীরে আঙিনায় সকাল নেমে আসে।

আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com