ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  শুক্রবার ● ২৮ জানুয়ারি ২০২২ ● ১৫ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার  শুক্রবার ● ২৮ জানুয়ারি ২০২২
শিরোনাম: রাত পোহালেই শিল্পী সমিতির নির্বাচন       লবিস্ট নিয়োগের ব্যাখ্যা বিএনপিকে দিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী       ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগ ​ভিত্তিহীন : দীপু মনি       পত্রিকা খুললেই পরীমনি-খুকুমণি আর দীপু মনি       মাহবুব তালুকদারসহ ইসির প্রায় ২০ জন করোনায় আক্রান্ত       সবচেয়ে দূষিত শহর ঢাকা        ৬ মাস টি-টোয়েন্টি খেলবেন না তামিম      
ইউরোপের রানি অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের বিদায়
জিল্লুর রহমান
Published : Sunday, 5 December, 2021 at 7:29 PM

অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল জার্মানির একালের সবচেয়ে বলিষ্ঠ চ্যান্সেলর। যার আরেক নাম ‘ইউরোপের ক্রাইসিস ম্যানেজার’। শুধু ইউরোপ নয়, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে এশিয়াতেও তার সমান প্রভাব। বিশ্ব রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটা প্রবাদ ছিল ‘ম্যার্কেলকে কখনো খাটো করে দেখো না’। অনেক আগেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর চ্যান্সেলর পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। অবশেষে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পর ২ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেন জার্মানির চ্যান্সেলর এঞ্জেলা ম্যার্কেল। খুব শীগ্রই নতুন সরকারের কার্যভার গ্রহণ করার কথা। এটা সত্য যে তিনি হচ্ছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্তমান নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে নেতৃত্বের পদে থাকা মানুষ এবং একমাত্র নারী। তিনি প্রায় ১০০টি ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। মাঝে মাঝে বলা হতো- অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলই ইইউ সম্মেলনের একমাত্র বয়স্ক ব্যক্তি। নিজের দায়িত্ব পালনকালে অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল পাঁচ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর শাসনকাল দেখেছেন। এ ছাড়া চার জন ফরাসি প্রেসিডেন্ট, সাত ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী, চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং আট জাপানি প্রধানমন্ত্রীর পালাবদল দেখেছেন। এটি একটি বিরল সৌভাগ্য ও বিরাট কৃতিত্বের পরিচয়। এজন্যই অনেকে বলেন তিনি হচ্ছেন ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচারের পর ইউরোপের রানি।
ম্যার্কেল ২০০৫ সালে প্রথম মেয়াদে নির্বাচনের পর থেকেই যে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতাদের মাঝে জায়গা করে নিয়েছেন, তাতে অনেকের ধারণা তিনি ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচারকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ২০০৯ এবং ২০১৩ সালের নির্বাচনেও জার্মান মানুষ তার পক্ষেই রায় দিয়েছিল। তিনি ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল জার্মানির মেকলেনবার্গ-ভোরপোমার্ন প্রদেশ থেকে জার্মান সংসদে সর্বাধিক সংখ্যক আসন জয়ের মাধ্যমে চ্যন্সেলর নির্বাচিত হন। ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগে তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন। যথাযোগ্য সামরিক মর্যাদার সঙ্গে বার্লিনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দফতরে সেই অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজ ও সৈন্যদের অর্কেস্ট্রায় বাজনা শোনানো হয়। ম্যার্কেলের সম্ভাব্য উত্তরসূরী ওলাফ শলৎস বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ম্যার্কেল তাকে ও তার ভবিষ্যৎ প্রশাসনকে আন্তরিক শুভকামনা জানান। প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক-ভাল্টার স্টাইনমায়ারও ম্যার্কেলকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন। করোনা সংকটের কারণে অনুষ্ঠানে বেশি সংখ্যক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে চরম দক্ষিণপন্থি এএফডি দল ছাড়া জার্মানির অন্য সব রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিরা ম্যার্কেলের বিদায়ী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের পরেও ম্যার্কেলকে কয়েকদিন কার্যনির্বাহী চ্যান্সেলর হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে করোনা সংকটের কারণে জার্মানিতে এই মুহূর্তে বিদায়ী সরকারের পক্ষেও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে করোনা সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়েছে। 
দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর সরকার প্রধান হিসেবে বিদায় নেওয়ার আগে নিজের ভাষণে ম্যার্কেল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রতিজ্ঞা করেন। তার মতে, যখনই কোথাও ঘৃণা ও সহিংসতাকে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার বৈধ হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়, তখনই গণতন্ত্রকামী হিসেবে আমাদের সহিষ্ণুতার সীমা শেষ হওয়া উচিত। তিনি জার্মানির মানুষের উদ্দেশে ঘৃণার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি সবসময়ে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও জগতকে দেখার পরামর্শ দেন। তিনি নিজের কার্যকালে বিভিন্ন সংকটের উল্লেখ করেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, করোনা মহামারী, ডিজিটালাইজেশন, শরণার্থী সংকটের মতো বিশাল চ্যালেঞ্জ সামলাতে নিজের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বহুপাক্ষিক কাঠামোগুলিকে ম্যার্কেল অপরিহার্য বলে বর্ণনা করেন। 
আসলে অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল ১৬ বছর ধরে জার্মান রাজনীতিতে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট দলের প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে এক আবেগময়ী ভাষণে তিনি দেশের ভেতরে ও বাইরে ‘জার্মানির উদার মূল্যবোধ’কে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাকে একজন বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক সময় বলা হতো তিনিই ‘জার্মানির রানি’। বাস্তবিক অর্থেই অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল বিশ্বের একজন ক্ষমতাধর নারী। তাকে তুলনা করা হয় ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচারের সাথে। অনেকে বলেন আসলে তিনি থেচারকেও ছাড়িয়ে গেছেন। মার্গারেট থ্যাচার একযুগ ব্রিটেনের ক্ষমতায় ছিলেন কিন্তু অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল ১৬ বছর ধরে জার্মান রাজনীতিতে চ্যান্সেলর হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং জার্মানিকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। 
এজন্য অনেকেই যেন তার মধ্যে ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের ছায়া দেখতে পান। মার্গারেট থ্যাচার ৪ মে, ১৯৭৯ থেকে ২৮ নভেম্বর, ১৯৯০ পর্যন্ত ব্রিটেনের ইতিহাসে একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কনজারভেটিভ পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েও যেভাবে শক্ত হাতে, বিভিন্ন বাধা অগ্রাহ্য করে তিনি ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক সংস্কার এনেছিলেন, তার জন্য তিনি আয়রন লেডি হিসিবে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন। 
অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল ১৯৫৪ সালের ১৭ জুলাই পশ্চিম জার্মানির হ্যামবুর্গে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম আঙ্গেলা ডোরোটেয়া ম্যার্কেল। তার পিতার নাম হোর্স্ট কাসনার এবং মাতার নাম হারলিন। ম্যার্কেল মা ছিলেন ল্যাটিন এবং ইংরেজির শিক্ষক। তিনি একসময় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য ছিলেন। ম্যার্কেল মায়ের পূর্বপুরুষেরা পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। তার এক ছোট ভাই এবং ছোট বোন আছে কিন্তু অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল দম্পতি নিঃসন্তান, তবে তারা শিশুদের অনেক ভালোবাসেন এবং শিশুদের জন্য নানা সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত। আঙ্গেলা ম্যার্কেল টেম্পলিন শহরের একটি স্কুলে পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি লাইপৎসিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞান পড়েন। শিক্ষার্থী থাকাকালে ম্যার্কেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর দাবিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ম্যার্কেল বার্লিনে অবস্থিত বিখ্যাত জার্মান বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিতে ভৌত রসায়ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেন এবং এখানেই তার কর্মজীবন শুরু করেন। সেসময় তিনি রুশ ভাষা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে শিখেছিলেন। কোয়ান্টাম রসায়নের ওপর গবেষণার জন্য তাকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এরপর তিনি এখানে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে তারই সহকর্মী ও পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক উলরিচ ম্যার্কেলকে বিয়ে করেন কিন্তু পাঁচ বছর পর তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। বিবাহবিচ্ছেদের পরও তার প্রথম স্বামীর রেখে দেওয়া ম্যার্কেল নামটি ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ব্যবহার করেন। এরপর রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ইওয়াখিম সাউয়ারের সাথে পরিচয় এবং পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির নিজেদের কোনো সন্তান নেই, তবে তার স্বামীর পূর্ববর্তী বিবাহ থেকে দুই ছেলে আছে।
তখনকার দিনে পূর্ব জার্মানিতে যেকোনো বিষয়ে পিএইচডি পেতে হলে মার্ক্স-লেনিনের তত্ত্বের ওপর দখল থাকার পাশাপাশি একটি কোর্সও করতে হতো। ম্যার্কেল সেই সুবাদে রাজনীতির হাতেখড়িটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পেয়ে যান। পূর্ব জার্মানির ক্ষমাতসীন ‘সোসালিস্ট ইউনিটি পার্টি’র যুব সংগঠন ফ্রি জার্মান ইয়ুথের সাথে যোগ দিলেন। তবে গবেষণাও পুরোদমে চলছিলো, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি কোয়ান্টাম ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির মতো কাটখোট্টা সব বিষয় নিয়ে সাতটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর বার্লিন ওয়ালের পতন আর দুই জার্মানির একীভূতকরণের ফলে জার্মানি যেন আগাগোড়া বদলে গেলো। দলে দলে পূর্ব জার্মানির গবেষকরা যোগ দিচ্ছে পশ্চিম জার্মানির গবেষণাগার আর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ম্যার্কেলের স্বামী সাউয়ার বার্লিনের হামবোল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। কিন্তু ম্যার্কেল দুই জার্মানির এই পুনর্মিলনের সময়কেই বেছে নেন তার রাজনীতির মঞ্চ হিসেবে। যোগ দেন ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নে। ১৯৯০ সালে সেই দলের হয়ে নির্বাচনে লড়েন এবং পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদদের সাথে পাল্লা দিয়ে জার্মান পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য হিসেবে যোগ দেন।
তৎকালীন চ্যান্সেলর হেলমুট কোহল দুই জার্মানির পুনর্মিলনের পর গঠিত প্রথম মন্ত্রীসভায় নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য পূর্ব জার্মানির কাউকেই খুঁজছিলেন। পুর্ব জার্মানির শেষ প্রধানমন্ত্রী লুথার ডি মেইজার সুপারিশ করলেন ম্যার্কেলের নাম। নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে ম্যার্কেল চ্যান্সেলরের সুনজরে আসেন। ১৯৯৪ সালে তাকে দেওয়া হয় পরিবেশ আর পারমাণবিক সুরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। দলে তার অবস্থান আর মতামতও জোরালো হতে থাকে।
অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের বাস্তববুদ্ধি অনেক সময় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে বহু সংকট পার হয়ে আসতে সহায়তা করেছে- যা কখনো কখনো ইইউর অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারতো। ২০১৫ সালের ইউরোজোনের সংকটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি গ্রিসের ত্যাজী অর্থমন্ত্রী ইয়ানিম ভারুফাকিসও স্বীকার করেন, তার দেশের আর্থিক দুরাবস্থা সত্বেও গ্রিসকে ইউরোজোনের ভেতরে রেখে ম্যার্কেল আসলে ইউরো মুদ্রাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। 
এসময় গ্রিসের কৃচ্ছসাধনের কর্মসূচি চাপিয়ে দেওয়ার পেছনে জার্মানিরই প্রধান ভূমিকা ছিল এবং এটাই তাদের রক্ষা করেছে। অর্থনৈতিক কৃচ্ছতা বা ব্যয় সংকোচন কর্মসূচি স্পেন আর ইতালির ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তারাও এর সুফল পেয়েছিল।
অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল যখন ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে জার্মানির সীমান্ত খুলে দিয়ে ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীকে সেদেশে ঢুকতে দিয়েছিলেন- তখন তিনি প্রশংসিত ও নিন্দিত দুটোই হয়েছিলেন। জার্মানির মানুষের একাংশ অন্যদের স্বাগত জানানোর সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য ম্যার্কেলের প্রশংসা করেন। কিন্তু অন্যরা এত অভিবাসীর আগমন দেখে ক্ষিপ্ত হন। তারা দলে দলে যোগ দেন উগ্র-দক্ষিণপন্থী এএফডি’র সাথে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ফেডারেল পার্লামেন্টে কোনো উগ্র-দক্ষিণপন্থী দল আসন জিততে সক্ষম হয়। তবে ম্যার্কলের পদক্ষেপের ফলে মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে ইইউর যে সুনাম ছিল তা পুনরুজ্জীবিত হয়। এতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। ২০১৬ সালের শেষ দিকে ওবামার মনে হয়েছিল অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের জার্মানিই হতে যাচ্ছে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
তা ছাড়া, ইউরোপজুড়ে শরণার্থী সংকটে বিশ্ব দেখেছে এক মমতাময়ী ম্যার্কেলকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেশিরভাগ দেশ যেখানে শরণার্থী নিতে অনাগ্রহী, সেখানে নিজে শুধু শরণার্থীদের জায়গা দিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি, ম্যার্কেল বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সমস্যার মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তার এই মমতাময়ী আচরণের কারণে জার্মানিতে তাকে অনেকেই ডাকে ‘মমতাময়ী মা’ নামে। তবে রাজনীতিতে আর কূটনীতির ময়দানে তার অসামান্য দক্ষতা তাকে নিয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ রাষ্ট্রনেতাদের কাতারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জার্মানির শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ফ্রান্স, রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুসংহত করেছেন এই নেত্রী। ইউরোপজুড়ে প্রবল অর্থনৈতিক মন্দা আর এর ফলে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কালো থাবা ম্যার্কেল জার্মানের নাগরিকদের ওপর পড়তেই দেননি। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান নারীদের তালিকার প্রথম স্থানটি তার দখলে টানা ছয় বছর ধরে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই নারী শুধু নারীদের মধ্যেই নয়, ফোর্বসের হিসাবানুযায়ী বিশ্বের সব ক্ষমতাধর নেতাদের মধ্যেও তিন নম্বর আছেন। তিনি ২০১৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই নারী খুবই সাধারণ ও সাদামাটা জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তিনি নিজেই সুপার মার্কেটে বাজার করেন, নাপিতের দোকানে অন্যদের পাশে বসে অপেক্ষা করেন, এমনকি সরকারি ভবন নয়, নিজের বাড়িতে থাকাই তার পছন্দ। আঙ্গেলা ম্যার্কেল অন্যান্য রাজনীতিকদের মতো বিলাসিতা একদম পছন্দ করেন না। বরং সাধারণ জীবনযাপনেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই স্বামীকে নিয়ে তিনি যতটা সম্ভব সেভাবেই চলার চেষ্টা করেন। তিনি চ্যান্সেলর হওয়ার আগেও যেভাবে সেলুনে বসে অন্যদের সাথে চুল কাটতেন, এখনো তাই করেন। তাকে কোনো বিশেষ ছাড়ও দেওয়া হয় না। 
চ্যান্সেলর ম্যার্কেল সাধারণ সুপার মার্কেটে গিয়ে নিজের বাজার নিজেই করেন, বিশেষ করে যেগুলো একটু বেশি সময় খোলা থাকে। বাজার করা সম্পর্কে আঙ্গেলা ম্যার্কেল একবার এক দোকানিকে বলেছিলেন, আমার এই অল্প অবসর সময়ে বাজার করার মতো সব কাজই করার চেষ্টা করি, যেমনটা আগে করতাম। অবশ্য যখন নিজে পারি না, তখন স্বামীর হাতে বাজারের লিস্ট তৈরি করে তুলে দেই এবং সেই করে নিয়ে আসে।  দোকানের একজন নারী কর্মী জানান, চ্যান্সেলর ম্যার্কেল অন্যান্য ক্রেতার মতোই কিছু খুঁজে না পেলে কোথায় কী রাখা আছে, তা সাধারণ গৃহিনীদের মতোই জানতে চান। তার নিরাপত্তার জন্য দেহরক্ষী সাথে না থাকলে কেউ হয়ত বুঝবেই না যে তিনিই আমাদের ‘অ্যাঞ্জি’। কর্মীটি আরো জানান, ‘শত ব্যস্ততার মধ্যেও চ্যান্সেলরের মুখে হাসিটুকু লেগেই থাকে, যা ভীষণ ভালো লাগে। 
আঙ্গেলা ম্যার্কেল নিজের রান্না ও কাপড় চোপর নিজেই পরিষ্কার করেন। যখন তিনি রান্না করার সময় পান না, তখন স্বামী ইওয়াখিম সাউয়ারকে নিয়ে বার্লিনের ‘কাসামবালিস’ নামের একটি রেস্তোরাঁয় খেতে যান। দামি খাবারের চেয়ে অবশ্য ‘গ্রিক মিটবল’র মতো সাধারণ খাবারই বেশি পছন্দ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই নারীর। হাতে দামি ব্যাগ রাখার চেয়ে ভালো খাওয়া-দাওয়া ম্যার্কেলের কাছে বেশি গুরত্বপূর্ণ। 
আঙ্গেলা ম্যার্কেল ও তার স্বামী ইওয়াখিম সাউয়ার বার্লিনের ‘মিউজিয়াম আইল্যান্ড’র একটি জাদুঘরের কাছে নিজস্ব, কিন্তু পুরানো একটা ফ্ল্যাটে থাকেন। চ্যান্সেলর হিসেবে শুধু নিরাপত্তার জন্য দু’জন পুলিশ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো। এ ছাড়া অন্য সব কিছু আগের মতোই আছে। যেমন ছুটি পেলে তারা দুজন কাছের উকারমার্ক নামের ছোট্ট শহরে চলে যান, সেখানেই তিনি বড় হয়েছেন। তা ছাড়া, আঙ্গেলা ম্যার্কেল সময় সুযোগ পেলেই স্বামীকে সাথে নিয়ে হাঁটতে বের হন। শারীরিক এবং মানসিকভাবে ‘ফিট’ থাকতে মুক্ত বাতাসে হাঁটা-চলা যে ভীষণ জরুরি, সেটা তিনি যেন সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। 
টাইম ম্যাগাজিন অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলকে ২০১৫ সালে ‘সেরা ব্যক্তিত্ব’ নির্বাচিত করেছে এবং অভিবাসন সঙ্কট ও ঋণ সমস্যা মোকাবেলায় তার নেতৃত্বের ব্যাপক প্রশংসা করে। টাইম সম্পাদক ন্যান্সি গিবস বলেন, ‘অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আজকের দুনিয়ায় তা সত্যিই বিরল।’ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান এবং নৈতিকতাকে ভিত্তি করে নেতৃত্ব দেওয়া তার একটি বিরল গুণ। এ জন্যই তিনি সেরা ব্যক্তিত্ব। জাতিসংঘও ম্যার্কেলের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ভূয়সী প্রশংসা করেছে। বিশ্বখ্যাত ‘ফোর্বস’ সাময়িকীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকার শীর্ষে তার নাম চারবার উঠে আসে।
দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি কী করবেন, গত কয়েকমাসে ম্যার্কেলকে এই প্রশ্নটি অনেকবার শুনতে হয়েছে। গত জুলাইতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তাকে আবারো এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রথমে একটা ‘ব্রেক’ নেবেন এবং কোনো ধরনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন না। তার একটা সুন্দর বিশ্রাম দরকার এবং সময় পেলে প্রাণভরে ঘুমাবেন ও অবসরে ভালো ভালো বই পড়বেন। তার কাজগুলো ‘এখন অন্যজন সামলাবে’ এটা তাকে মেনে নিতে হবে বলে জানিয়ে ম্যার্কেল বলেন, আমার মনে হয় এটা আমার খুবই ভালো লাগবে। স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে অবসর নেওয়ার কারণেও এ নারী ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। 

লেখক : ব্যাংকার ও কলাম লেখক। 
আজকালের খবর/আরইউ


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.net, www.ajkalerkhobor.com