ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  বৃহস্পতিবার ● ১৭ জুন ২০২১ ● ৩ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার  বৃহস্পতিবার ● ১৭ জুন ২০২১
শিরোনাম: সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি শুরু হচ্ছে       দাতার কাতারে বাংলাদেশ       পূর্ত ভবনে অস্ত্রের মহড়া: আওয়ামী লীগ নেতাদের অব্যাহতি       পরীমনির বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাবের, পরিদর্শনে যাবে পুলিশ       বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে নিতে ব্যর্থ মন্ত্রণালয়       বাজেট পাসের পরেই এমপিওর আবেদন       চীনকে এক হাত নিলেন জি-৭ নেতারা, কোভিডের উৎসের তদন্ত দাবি      
হেফাজতের নতুন কমিটিতেও রাজনীতিকরা
শফিপুত্র বললেন ‘ছেলে খেলা’
নিজস্ব প্রতিবেদক
Published : Tuesday, 8 June, 2021 at 2:02 AM, Update: 08.06.2021 2:05:30 AM


হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের পদে না রাখার কথা বলা হলেও ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটিতে অনেকেই আছেন—যারা সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা। কমিটি গঠনের নামে স্বজনপ্রীতি আর আত্মীয়করণ হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠাতা আমির আহমদ শফীর ছেলে সংগঠনটির সাবেক প্রচার সম্পাদক আনাস মাদানী নতুন কমিটি গঠনকে ছেলে খেলা আখ্যায়িত করে বলেছেন, আগের মতোই গঠনতন্ত্র ‘লঙ্ঘন’ করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটিতে আনাস মাদানি না থাকলেও শফীর বড় ছেলে মো. ইউসুফের নাম রয়েছে। তবে তিনিও বলেছেন, তার সম্মতি ছাড়াই কমিটিতে তার নাম দেওয়া হয়েছে। তিনি এই কমিটির সঙ্গে নেই।
এক যুগ আগে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই কওমিমাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের আমির ছিলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী, সদস্য সচিব ছিলেন জুনাইদ বাবুনগরী।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে আহমদ শফী মারা যাওয়ার পর নানা আলোচনার মধ্যে গত ১৫ নভেম্বর সম্মেলনে জুনাইদ বাবুনগরীকে আমির করে হেফাজতের ১৫১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠিত হয়েছিল।
হাটহাজারী মাদ্রাসার কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধে বাবুনগরীকে গত বছরের শুরুর দিকে মাদ্রাসা ছাড়তে হয়েছিল। বছরের মাঝামাঝিতে আবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে মাদ্রাসায় শফীর কর্তৃত্ব খর্ব হয়। মৃত্যুর আগের দিন শফী পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পাশাপাশি তার ছেলে আনাস মাদানিকে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার হতে হয়।
এদিকে মাদ্রাসার কর্তৃত্বে ফেরা বাবুনগরীর আমিরের দায়িত্ব নেওয়া তখনো মেনে নিতে পারেননি শফী সমর্থকরা।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনে বিরোধিতা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে হেফাজতের কর্মসূচি সহিংসতায় গড়ালে চাপের মুখে গত ২৫ এপ্রিল কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন বাবুনগরী।
তারপর একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন হলেও দেড় মাস পর সোমবার ( ৭ জুন ) ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটির ঘোষণা দেন হেফাজতের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী।
বাবুনগরীকে আমির পদে রেখে গঠিত এই কমিটিতে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। শুধু সহিংসতার মামলায় গ্রেপ্তার মামুনুল হকসহ বিভিন্ন নেতাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
নতুন কমিটিতেও স্থান না পাওয়া আনাস মাদানি  বলেন, কমিটি ঘোষণার আগে আমাদের সাথে কোনো আলোচনা করেনি। দাওয়াতও দেয়নি। আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করছে না।
‘অরাজনৈতিক’ বলার পরও এই কমিটিতে রাজনৈতিক দলের নেতারা রয়েছেন বলে দাবি করেন শফীপুত্র।
তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে যে সহিংসতা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে সেসব মামলার আসামিদেরও কমিটিতে রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে হেফাজতে ইসলামের মত দেশব্যাপী একটি সংগঠন কাজ করতে পারবে না।
হেফাজতের কমিটি কীভাবে গঠিত হবে, তার দিক-নির্দেশনা সংগঠনের গঠনতন্ত্রে রয়েছে জানিয়ে সাবেক প্রচার সম্পাদক আনাস মাদানী বলেন, আগেও (নভেম্বরে) যে কমিটি করা হয়েছিল, সেখানেও নিয়ম মানা হয়নি। তারাই বিলুপ্ত করেছেন। তারাই আবার নতুন কমিটি করেছেন। এবারও কাউন্সিল না ডেকে তা করা হয়েছে। সবাইকে না জানিয়ে এভাবে কমিটি করা হেফাজতে ইসলামের গঠনতন্ত্রে নেই।
এই প্রক্রিয়ায় কমিটি ঘোষণাকে ‘ছেলে খেলা’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এটা নতুন কিছু না। দেশবাসী আগেও তাদের চালাকি দেখেছে। এখনও জানছে।
কমিটিতে বড় ভাই মো. ইউসুফের থাকার বিষয়ে আনাস মাদানি বলেন, আমার বড় ভাইকে তারা টেলিফোন করেছিল। উনি সম্মতি দেওয়া ব্যতীত উনাকে কমিটিতে রেখেছেন। উনি তা প্রত্যাখ্যা্ন করেছেন।
মো. ইউসুফ  সাংবাদিকদের  বলেন, আমার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে আমি বলেছি আমি কোনো কমিটিতে থাকব না। আমার সম্মতি ছাড়াই নাম দিয়েছে। এখন এটা নিয়ে আমি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি।
আমি কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠনে ছিলাম না। আমি ওই মেজাজের মানুষই না। আমি আছি মাদ্রাসা (রাঙ্গুনিয়ায় একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন) নিয়ে এবং আমার আম্মাকে নিয়ে। কেন আমাকে নিয়ে এসব টানাহেঁচড়া জানি না।
আপনারা সবাইকে জানান, আমি কোনো কমিটিতে নেই। হেফাজতের শুরু থেকে আমি কোনো কমিটিতে ছিলাম না, বলেন তিনি।
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিষয়ে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করছেন জানিয়ে আনাস মাদানি বলেন, সময় মতো আপনাদের জানাব।
শফীর অনুসারী আরেক নেতা মঈনুদ্দিন রুহীও একই কথা বলেন, যিনি শফী আমির থাকার সময় যুগ্ম মহাসচিবের পদে থাকলেও পরে আর কমিটিতে স্থান পাননি।
রুহী  বলেন, এটা অবৈধ ও অসাংবিধানিক কমিটি। জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য পকেট কমিটি করা হয়েছে। জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এতে নেই।
আহ্বায়ক কমিটির নামে তারা ফটিকছড়ি সমিতি করেছিল। এখন পুরনো বউকে নতুন শাড়ি পড়াইছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের চিনে।
মঈনুদ্দিন রুহী বলেন, আমরা চেয়েছিলাম হেফাজতে ইসলামে সমান্তরালভাবে সবাই থাকবে। তারা দেশের ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। এই কমিটি করে কোনো একটা রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে তারা।
অথচ তারা আগে বলেছিল রাজনৈতিক কাউকে রাখবে না। ৩৩ জনের মধ্যে ১৩ জনই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা।
১০ জুন বৃহস্পতিবার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে হেফাজতের প্রয়াত আমির শাহ আহমদ শফীর জীবনী ও বর্তমান সঙ্কট উত্তরণ বিষয়ক আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়েছে জানিয়ে রুহী বলেন, সেখানে আমরা ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করব। তারপর সবাইকে জানাব।
সোমবার (৭ জুন) সকালে হেফাজতের ৩৩ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন মাওলানা নুরুল ইসলাম জেহাদী। এই কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নেতৃত্বে রাজনীতিকরা আছেন। এছাড়া বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, সিলেটের আজাদ দ্বিনি এদারা, তানজিমুল মাদারিসসহ কওমি ধারার সর্বোচ্চ শিক্ষা কর্তৃপক্ষ হাইয়াতুল উলইয়া সংশ্লিষ্টরাই রয়েছেন।
নতুন কমিটিতে রাজনীতিকদের মধ্যে আছেন—নায়েবে আমির আতাউল্লাহ হাফেজ্জি, যিনি খেলাফত আন্দোলনের আমির। যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আনোয়ারুল করিম,  জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের  সহ-সভাপতি পদে আছেন। দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক  মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী হলেন খেলাফত মজলিসের নেতা। সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস খেলাফত আন্দোলনের নেতা। জামায়াতে ইসলামের কোনও পদে না থাকলেও হেফাজতের প্রচার সম্পাদক  মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী জামায়াতভিত্তিক ওলামা মাশায়েখ ও মসজিদ মিশন কেন্দ্রিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া তিনি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের সদস্য।
আলেমদের অভিযোগ, হেফাজতে ইসলামের এই কমিটি গঠনের নামে স্বজনপ্রীতি আর আত্মীয়করণ করা হয়েছে। হেফাজত আমির মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হচ্ছেন আপন মামা-ভাগ্নে।
কওমি মাদ্রাসার আলেমরা বলছেন, নতুন কমিটি গঠনের নামে মূলত হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ—রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি কওমি শিক্ষায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড আছে, ঘোষিত কমিটিতে এখন সেই বোর্ডের কর্তাদের সামনে আনা হয়েছে। এতে মাদ্রাসা শিক্ষার ওপরে প্রভাব পড়বে।
শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যুক্তদের বিষয়ে জানা গেছে, জুনায়েদ বাবুনগরী বেফাকের আমেলা সদস্য। নুরুল ইসলাম জিহাদী বেফাকের নায়েবে আমির এবং হাইয়ার স্থায়ী কমিটি সদস্য। আতাউল্লাহ হাফেজ্জি বেফাকের নায়েবে আমির এবং হাইয়ার স্থায়ী কমিটি সদস্য। সালাউদ্দিন নানুপুরী বেফাকের আমেলা সদস্য। সাজেদুর রহমান বেফাকের নায়েবে আমির এবং হাইয়ার স্থায়ী কমিটির সদস্য। মুহিব্বুল্লাহ গাছবাড়ি সিলেটের আজাদ দ্বিনি বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। মাওলানা আব্দুল হক বেফাকের নায়েবে আমির ও হাইয়ার স্থায়ী কমিটি সদস্য। মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস নায়েবে আমির ও স্থায়ী কমিটি সদস্য। মুফতি জসিম উদ্দিন বেফাকের সদস্য এবং স্থায়ী কমিটি সদস্য। আনোয়ারুল করিম বেফাকের নায়েবে আমির।
জানতে চাইলে খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী  বলেন, ‘হেফাজত একটি অরাজনৈতিক, হাটহাজারীভিত্তিক ও উপজেলাভিত্তিক সংগঠন ছিল। পরে সংগঠনের মেরুকরণ হয়েছে। সাংগঠনিকভাবে যে অবস্থান থেকে কমিটি করা হয়েছে, তাতে অযৌক্তিক মনে করি না। তবে হেফাজত যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর যারা কারাগারে আছেন, তারাও হেফাজতের পরিচয়েই কারাগারে, সেই হিসেবে হেফাজতের নেতৃত্বকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা দরকার ছিল’, বলে মনে করেন মুনতাসির আলী।
এ প্রসঙ্গে হেফাজতের মহাসচিব  মাওলানা হাফেজ নূরুল ইসলাম জেহাদী বলেন, সবার সঙ্গে আলাপ করেই কমিটি করা হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তরা কমিটিতে আছেন, তবে অল্প কয়েকজন। তারা মূল দায়িত্বে নেই। আগের কমিটিতে ছিল ১৫১ জন, সেখান থেকে বাছাই করে ৩৩ জন করা হয়েছে। যাদের নাম নেই, কমিটি পরামর্শ করে যাদের আনা যায়, তাদের আনা হবে। এনএমএস।










সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com